আজ মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২০ ইং, ৩০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সাতক্ষীরার হাফিজুল ক্লিনার থেকে ম্যানেজার

আমিরাত সংবাদ

লোকমান বিন নূর হাসেম, সৌদি আরব. 

শেখ হাফিজুল ইসলাম ১৬ মে ১৯৯৬ইং সৌদি আরবে ক্লিনার (পরিচ্ছন্নকর্মী) হিসেবে প্রবাস জীবন শুরু করেন। বর্তমানে তার অধীনে কাজ করে বিভিন্ন দেশের ৩ শতাধিক লোক। সৌদি আরবে চাকুরীর পাশাপাশি ইনপোর্ট এক্সপোর্ট ব্যবসায় অত্যান্ত সুনাম অর্জন করেছেন। জানা যাক এই সফল প্রবাসীর সফলতার গল্প :
অষ্টম শ্রেনী পাস কারার পর আর স্কুলে যাননি শেখ হাফিজুল ইসলাম। পড়ালেখার সমাপ্তি করে ব্যবসায় মনোযোগ দেন। পাট, হলুদ সহ নানা ধরনের ব্যবসা করেন কিন্তু তেমন সুবিধা করতে পারেননি কোন ব্যবসায়। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেন বিদেশ যাওয়ার। ১৯৯২ সাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় দৌড় ঝাপ শুরু করেন প্রবাসে আসার জন্য। চার বছর পর সুযোগ হয় বিদেশে আসার।
তার মতে বিদেশে আসা যত সহজ মনে করা হয় আসলে তত সহজ নয়। এক শ্রেনীর অতি মুনাফা লোভী দালাল চক্র খুব জটিল করে রেখেছে বিষয়টিকে। দালাল চক্রের কবলে পড়েন শেখ হাফিজুল ইসলাম। ১৯৯৬ ইং সনের ২৮ জানুয়ারী ফ্লাইটের কথা বলে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। বাড়ির সবাই জানে ২৮ জানুয়ারী সে সৌদি আরব চলে গেছে। তার বাবা-মা অধীর অপেক্ষায় চেয়ে আছেন কবে সন্তানের চিঠি পাবে যাতে লেখা থাকবে “ প্রিয় আব্বু- আম্মু তোমরা কোন চিন্তা করো না আমি ভালো ভাবে সৌদি আরবে পৌছেছি এবং তোমাদের দোয়ায় খুব ভালো আছি”। সপ্তাহ পেড়িয়ে মাস অতিবাহিত হয়ে যায় কোন চিঠি আসে না সন্তানের। চিন্তায় পড়ে যান তার বাবা মা।
এদিকে শেখ হাফিজুল এর জীবনও বিষিয়ে উঠতে শুরু করে। কোন কিছুই ভালো লাগে না দালালদের হাতে তিনি বন্ধি কিন্তু কিছু করার নেই, দালাল চক্রের শিকড় যে অতি গভীরে। তখন ফোন, মোবাইলও সাধারণত পাওয়া যেত না যে বাড়িতে নিজের পরিস্থিতির কথা জানাবে। অবশেষে চার মাস ঢাকায় দালালদের কাছে থাকার পর ১৬ মে ১৯৯৬ইং সৌদি আরবে পৌছার সুযোগ হয় তার। সৌদি আরব নেমে দীর্ঘ নিশ্বাস নেন। মুক্তি পান দালাল চক্রের বন্ধিশালা থেকে।
তিনি প্রবাসে আসেন একটি কোম্পানীতে ক্লিনারের ভিসায়। কোম্পানীতে ক্লিনারের কাজ করতে থাকেন। এ কাজে যে সীমিত বেতন তাতে পোষাতো না। তাই কোম্পানীর একজন অফিস স্টাফ আব্দুল আজীজ মুহসীন এর বাসায় পারটাইম জব করতেন হাফিজুল ইসলাম। রাতে মার্কেটের সামনে দাড়িয়ে থাকতেন গাড়ি ধোয়ার জন্য এগুলো ছিল তার বাড়তি আয়। আব্দুল আজীজ মুহসীনের বাসায় যাতায়াত করতে করতে তার এক বন্ধু মিশাল আব্দুল কাদের আল মুবায়েদ এর নজরে পড়ে যান শেখ হাফিজুল ইসলাম।
মিশাল আব্দুল কাদের আল মুবায়েদ  হাফিজুলের মাঝে কোন সুপ্ত প্রতিভা দেখেছিলেন। হয়তো  তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই ছেলেকে দিয়ে তিনি হতে পারবেন সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই তিনি হাফিজুলকে প্রস্তাব দেন তুমি এই কাজ ছেড়ে দাও আমি তোমাকে একটি নতুন ভিসা দিচ্ছি। তুমি দেশে গিয়ে আমার এই ভিসায় আসো তোমাকে আমি ভালো কাজ দিবো। এই প্রস্তাব পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন এবং দেশে গিয়ে নতুন ভিসায় আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। মনে মনে অনেক রঙ্গীন স্বপ্ন দেখতে লাগলেন।
নিজ কোম্পানী থেকে হাফিজুল দেশে চলে যাওয়ার কথা বললে তার কোম্পানী তাকে দেশে পাঠাতে রাজি হল না। তার রঙ্গীন স্বপ্নের উপর কুয়াশার আবরন পরতে শুরু করল। তিনিও খুব সহজে হাল ছেড়ে দিলেন না। অবশেষে লেবার কোর্টের আশ্রয় নিতে চাইলে কোম্পানী বাধ্য হয়ে তাকে দেশে পাঠায়।
তিনি নতুন ভিসা নিয়ে দেশে চলে যান এবং ২০০০ইং সালের জানুয়ারীতে ২য় বারের মত সৌদি আরবে আসেন। এখন তার কফিল মিশাল আব্দুল কাদের মুবায়েদ। হাফিজুল ভাবতে থাকেন এখন কোন ভালো চাকুরি পাবেন মিশাল আব্দুল কাদেরের অধীনে কিন্তু তার ভাবনা শুধু ভাবনাই রয়ে যায় আবারো তার নসীবে জুটে মিশালের অফিস ক্লিনের কাজ। তবে এই কাজ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি ছয় মাস পর তার অফিস বিক্রি করে দেন এবং এয়ার কন্ডিশনের দোকান দেন।
হাফিজুলের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে, ক্লিনারের চাকুরি থেকে মুক্ত হন। তাকে এ/সির দোকানের সেল্স ম্যান বানানো হয়। শেখ হাফিজুল ইসলাম মনে মনে খুব খুশি হন । কিন্তু এসির দোকানে লাভ না হওয়ায় দোকান বিক্রি করতে বাধ্য হন তার কফিল চলে যায় তার সেলস ম্যানের চাকুরি। এবার সিদ্ধান্ত নেন একটি সুপার মার্কেট দেয়ার। কফিল সুপার মার্কেট দিলে সেখানে চাকুরি শুরু করেন কিছু দিন যেতে না যেতে এটিও বন্ধ হয়ে যায়। অতপর ফ্রেশ চিকেনের দোকান দেন। এখানেও সফল হতে পারেননি তাই এটিও বন্ধ। এবার দিলেন একটি ফাষ্ট ফুডের দোকান ভাবছিলেন এখানে সফল হবেন কিন্তু সফল হতে পারলেন না। ফলাফল দোকান বন্ধ। অতপর দুই বছর ড্রাইভিং করেন। একদিন তার কফিল তাকে ডেকে বললেন হাফিজ আমরা যে কাজ শুরু করি শুধুই লোকসান হয় সফলতার মুখ দেখতে পাই না তাহলে এখন কি করা যায়? তোমার কাছে কি সুন্দর কোন পরামর্শ আছে ? হাফিজুল বলে সুন্দর একটি বিজনেস আছে যে বিজনেসে কোন লোকসান নেই। আগ্রহের সাথে জানতে চাইলো তার কফিল কি সেই বিজনেস ? প্রতি উত্তরে হাফিজুল বললো আমাদের এলাকায় একটি মসজিদ প্রয়োজন। মসজিদ আল্লাহর ঘর একটি আল্লাহর ঘর বানিয়ে দাও লোকজন নামাজ পড়ে তোমার জন্য দোয়া করবে আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করবে। এখানে কোন লোকসান নেই। হাফিজুলের কথা মত তিনি তাই করলেন বাংলাদেশে তিনি নিজ খরচে একটি মসজিদ নির্মাণ করে দিলেন।
মিশাল আব্দুল কাদের মুবায়েদ আবারো হাফিজুলকে নিয়ে বসলেন নতুন কি ব্যবসা করবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। এবার তারা এই সিদ্ধান্তে উপনিত হলেন যে ইন্টারনেট ক্যাফের (কল সেন্টার) দোকান দিবেন। যেই ভাবনা সেই কাজ একটি ক্যাফের দোকান দিলেন। এই ব্যবসায় তারা খুব সফলতা অর্জন করলেন। হাফিজুল ও তার কফিল খুব খুশি। যত দিন যায় তাদের ব্যবসা বেড়েই চলে ফলে আরো দুইটি ইন্টারনেট ক্যাফ বৃদ্ধি করেন। কিন্তু এক পর্যায়ে যখন সবার হাতে হাতে উন্নত মোবাইল সেট আসা শুরু করলো তখন সবাই মোবাইল সেটে ইন্টারনেট সুবিধা ভোগ করা শুরু করল ফলে এই ব্যবসাও ডাউন হয়ে গেল। তবে এত ধরনের ব্যবসা করাও বন্ধ হয়ে যাওয়া সত্বেও কেউ কাউকে কোন প্রকার দোষারপ করেনি কারণ তাদের সব কাজ চলছিল পরামর্শের ভিত্তিতে। এক পর্যায়ে ইন্টারনেট ক্যাফ বন্ধ করে কফি সপ এর দোকান দিলেন এবং শেখ হাফিজুল ইসলামকে ম্যানেজারের দায়িত্ব দিলেন। কিছুদিন চলার পর এটিও বন্ধ হয়ে যায়।
আবার তারা নতুন করে ভাবতে থাকে কি করা যায়। হাফিজুল তাকে পরামর্শ দিলেন হোটেল ব্যবসা করার জন্য। তিনি হাফিজুলের পরামর্শ অনুযায়ী তাই করলেন। সুন্দর ডেকোর করে একটি হোটেল দিলেন। নাম দিলেন “ইন্ডিয়ান প্যালেস”। হাফিজুল ইসলামকে বানানো হল ম্যানেজার। হোটেলের বাহিরের কারুকার্য ছিল চোখে পড়ার মত যে কারো নজর কাড়বে এক মুহুর্তে। এটি অতি অল্প সময়ে আভিজাত হোটেলে পরিনত হয়। খাবারের আইটেমও ছিল ব্যতিক্রম তাই এক পর্যায়ে সৌদিদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করে নেয় এই “ইন্ডিয়ান প্যালেস”। জমজমাট চলতে থাকে তাদের হোটেল ব্যবসা। এই হোটেল বিজনেস চালু করার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি শেখ হাফিজুল ইসলাম ও তার কফিলকে।
কিছুদিন না যেতেই চালু করলেন আরো একটি হোটেল। এটির নাম দিলেন “ইন্ডিয়ান স্টাইল”। এটিও ব্যাপক সাড়া জাগালো সৌদিদের মাঝে। শেখ হাফিজুল ইসলামের কফিল তার উপর মহাখুশি কারণ তার পরামর্শেই এই ব্যবসা শুরু করা হয়েছে এবং তার দক্ষ পরিচালনায় দিন দিন সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । কিছুদিন পর চালু করেন “ ছামাকাতি সী ফুড” নামে আরো একটি হোটেল। পর্যায়ক্রমে “কসর আল হিন্দ” ও “আহাল আল মাশায়ী” নামে আরো দুটি হোটেল চালু করেন। এখন তাদের হোটেল সংখ্যা পাঁচটি। এখানে কাজ করছে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়ান, নেপাল, ফিলিপিন ও মিশরের প্রায় তিন শতাধিক লোক যাদের মূল দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের একজন সুযোগ্য নাগরিক শেখ হাফিজুল ইসলাম। তিনি সবগুলো হোটেলের জিএম এর দায়িত্ব সুনামের সাথে পালন করছেন। তিনি এইট পাস হলেও বিভিন্ন দেশের অনেক বড় বড় ডিগ্রীধারী তার অধীনে কাজ করছে। উল্লেখ্য এই পাঁচটি হোটেলের প্রতিটি এরাবিয়ানদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বর্তমানে তিনি চাকুরির পাশাপাশি তার কফিলের সাথে ইনপোর্ট এক্সপোর্ট এর ব্যবসা করে যাচ্ছেন। এখানেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এবং অনেক সুনাম অর্জন করেছেন। নিজের মেধা খাটিয়ে তিনি যেমন হয়েছেন প্রতিষ্ঠিত অনুরুপ নিজের কফিলকেও করেছেন সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই কফিলও তার উপর খুব সন্তুষ্ট। এক সময়ের ক্লিনার শেখ হাফিজুল ইসলাম আজ রিয়াদের শীর্ষ স্থানীয় পাঁচটি হোটেলের জিএম এবং একজন বড় মাপের ব্যবসায়ী। তার অধীনে কাজ করছে আজ বিভিন্ন দেশের তিন শতাধিক লোক।
এই সফল প্রবাসীর পিতা শামছের শেখ ও মাতা আয়েরা বেগম। তার বাড়ি গ্রামঃ জেঠুয়া, থানাঃ তালা, জেলাঃ সাতক্ষীরা। তিনি বলেন আমার বিশ্বাস কেউ যদি আল্লাহর উপর ভরসা করে সঠিক পন্থায় চেষ্টা চালিয়ে যান, পিছু না হটেন এবং লেগে থাকেন তাহলে সফলতা একদিন তার কাছে ধরা দিবেই।