আজ বৃহস্পতিবার, ১লা অক্টোবর, ২০২০ ইং, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বিপদগ্রস্ত প্রবাসীরা ঢাকার রাজপথে

আমিরাত সংবাদ

দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে মালয়েশিয়া প্রবাসী নরসিংদীর রায়পুরার মো: মোস্তফা। গত কয়েক বছর হলো নিয়মিত তিনি ছুটিতে দেশে আসেন। পরিবার ও স্বজনদের সাথে এক-দুই মাস থেকে চলে যান মালয়েশিয়ার কর্মস্থলে। সেখানে তিনি একটি ফার্নিচার কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি বলেন, গত ২৬ জানুয়ারি ছুটিতে দেশে আসেন। ছুটি শেষে যখন মালয়েশিয়ায় ফেরত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখনই করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। মালয়েশিয়ার সাথে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কেটে গেল কয়েক মাস। কিন্তু এখনো নিশ্চিত নই কর্মস্থলে ফিরতে পারব কি না।

তিনি বলেন, অনেক দেনা করে বিদেশে গিয়েছিলাম। দেনা শোধ করে বাড়িতে ঘরদুয়ার ঠিক করেছি। এর বাইরে তেমন কোনো চালান (পুঁজি) করতে পারিনি। গোছানো যা কিছু ছিল তা শেষ হয়েছে আরো আগেই। সরকার ঘোষণা দিয়েছে প্রবাসীদের সহজ শর্তে ঋণ দেবে, কিন্তু ঋণের জন্য নরসিংদী প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে বারবার গিয়েও পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের কঠিন সব শর্ত, দু’জনের ব্যাংক গ্যারান্টি লাগবে, একজন হতে হবে সরকারি চাকরিজীবী। নিজের লোক না থাকলে কে আমার ব্যাংক গ্যারান্টার হবে?

স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খুবই নাজুক অবস্থায় আছেন জানিয়ে এই প্রবাসী ঢুকরে কেঁদে ফেলেন। বলেন, ৫০০ টাকা একজনের কাছ থেকে হাওলাত (ঋণ) করে ঢাকায় এসেছি মানববন্ধন করতে। যদি সরকার আমাদের দিকে তাকায়। আমরা যারা দেশে এসে আটকে আছি তাদের যেন মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। আর না হলে যেন শর্তহীন ঋণ দেয়।

গত মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভেতরে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় মোস্তফার সাথে। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক মোস্তফার পরিবারে স্ত্রী ছাড়াও বাবা-মা রয়েছেন। সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি উল্লেখ করে বলেন, প্রবাস জীবনে ফার্নিচার ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছি। যদি ঋণ পেতাম তা হলে নিজেই একটা ফার্নিচারের দোকান দিতাম। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ দিন ছুটিতে দেশে আসা শতাধিক মালয়েশিয়া প্রবাসী মানববন্ধন করেন। তাদের মূল দাবি দু’টি। একটি হলো কূটনৈতিক তৎপরতায় মালয়েশিয়ায় যেন তাদের কর্মস্থলে ফেরত পাঠানো হয়। আর যারা যেতে পারবেন না বা যাবেন না, তাদের যেন দেশেই কোনো কিছু করার জন্য শর্তহীন ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। ছুটিতে দেশে থাকা অবস্থায় তাদের দুঃখকষ্টগুলো তুলে ধরেন বক্তৃতায়।

মানববন্ধনে শরিক হওয়া মালয়েশিয়া প্রবাসী জসিম, রুবেল, সবুজ, সাদ্দাম প্রমুখের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা বলছেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় তারা ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো কিনারা হয়নি। একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই পারেন তাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে।

জানা যায়, করোনা মহামারীতে গত মার্চ মাস থেকে মালয়েশিয়ার সাথে বিমান যোগাযোগ বন্ধ। মাঝখানে গত জুলাই মাসে শর্তসাপেক্ষে ট্রানজিট যাত্রী, মালয়েশিয়ার রেসিডেন্স পারমিটধারী, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশসহ ২৩ দেশের সাথে বিমান যোগাযোগ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া।

বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে মানববন্ধন করেন প্রায় এক শ’ গ্রিস প্রবাসী। এর আগে তারা রাজধানীর ইস্কাটনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনেও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। বিভিন্ন সময়ে তারা দেশে ছুটিতে এসে করোনা মহামারীতে আটকা পড়েছেন। সরকারের বিভিন্ন মহলের কাছে ধরনা দিয়েও তারা ফ্লাইট জটে যেতে পারছেন না বলে জানান। রাফি নামের এক গ্রিস প্রবাসী বলেন, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের বিভিন্ন সময়ে আমরা দেশে এসেছি। ছুটিতে এসে আমরা এই করোনা মহামারীতে ফেঁসে গেছি। বিমান চলাচল বন্ধের কারণে আমরা যেতে পারছি না। বাংলাদেশ দূতাবাস ও সরকার কূটনৈতিকভাবে গ্রিস সরকারের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের পাঠানোর ব্যবস্থা করুক। না হলে আমাদের জন্য বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করুক। যেকোনোভাবে আমরা গ্রিসে যেতে চাই।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরেও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়েছে। সেখানে ব্রুনাই দারুসসালাম থেকে প্রতারিত ও নির্যাতিত হয়ে তারা দেশে ফেরা প্রবাসী ও তাদের স্বজনরা অংশ নেন।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দালাল মেহেদী হাসান বিজন, আবদুর রহিম চক্রের মাধ্যমে ব্রুনাই গিয়ে প্রতারিত ও নির্যাতিত হয়ে তারা দেশে ফিরেছেন। এই দালালচক্রের কবলে পড়ে হাজার হাজার প্রবাসী ব্রুনাইয়ের জঙ্গলে ও রাস্তায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের মধ্যে এই চক্রের মূলহোতা বিজনের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২০টি মানবপাচার মামলা রয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন তাদের গ্রেফতার করছে না- এ নিয়ে সবার প্রশ্ন।

মানববন্ধনে প্রতারণার শিকার শরীয়তপুরের জাজিরার মো: আতিক, মুন্সীগঞ্জের মো: আল আমিন, টাঙ্গাইলের নজরুল ইসলাম, খাদিমুল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। তাদের মধ্যে অনেকের অভিযোগ, দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয় না।

মানববন্ধনে ভুক্তভোগীরা বলেন, মানবপাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার বিজনসহ কয়েকজন দালালের পাসপোর্ট বাতিল করে। ব্রুনাই সরকার তাদের গ্রেফতার করে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রম থেমে নেই। এখন শোনা যাচ্ছে বিজনের পাসপোর্ট নাকি ফিরে পেয়েছে। তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো নেয়া হয়ইনি, বরং সে নাকি ফের ব্রুনাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ সে নাকি পলাতক! মানববন্ধন থেকে অবিলম্বে বিজনসহ দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

  • কাওসার আজম
  • নয়া দিগন্ত